আসাদুর রহমান শার্শা সংবাদদাতা।।প্রকৃতি প্রেমী ওয়াহেদ আলী সরদারের কথা হয়তো অনেকে জেনে থাকবে। ঘর-সংসার ফেলে দেশের বিভিন্ন জায়গায় গাছ লাগিয়ে ও গাছ থেকে পেরেক তুলে বেড়ান ওয়াহেদ আলী সরদার। পেশায় তিনি একজন রাজমিস্ত্রী হলেও এই কাজটা তার নেশা। গাছের ওপর নির্যাতন বন্ধ ও গাছের জীবন রক্ষায় দিনরাত ঘুরে বেড়ান তিনি। তিনি যেন গাছের বোবা কান্না শুনতে পান। গাছের এই কান্নার প্রতিকারে গাছ থেকে বিল বোর্ড ও পেরেকে ক্ষতবিক্ষত গাছের গভীরে ঢোকানো পেরেক তুলে আনেন তিনি।
যশোর সদরের সাড়াপোল গ্রামে বাড়ি ওয়াহেদ সরদারের। সংসার জীবনে তার স্ত্রী ও দুই ছেলে রয়েছে। যারা সবাই শিক্ষিত এবং কর্মঠ হওয়ায় বিল বোর্ড টাঙানোর জন্য বেআইনিভাবে গাছে ঠোকা পেরেক তুলে ফেলে গাছের জীবনকে রক্ষা করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন তিনি। ওই ব্যতিক্রমী কাজ করতে গিয়ে তিনি পেয়েছেন অনেক সম্মান অনেক ভালবাসা । তিনি ইতোমধ্যে আনুমানিক ৯মণ পেরেক তুলে রেকর্ড সৃষ্টি করেছেন। বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে গাছ থেকে তিনি এই পেরেক তোলেন। যার সব গুলো তার বাড়িতে জমা করা রয়েছে
ওয়াহেদ আলী সরদার জানান, ২০১৭ সালের ১৮ জুলাই যশোর টাউন হল মাঠের দক্ষিণ-পূর্ব কোণের একটি মেহগনি গাছের পেরেক তোলার মধ্য দিয়ে তার এ অভিযান শুরু করেন। একটানা তোলেন গত ২০ মার্চ পর্যন্ত। ওই দিন পেরেক তোলেন চৌগাছা গরুহাটে। দীর্ঘ সাড়ে ৮ মাসে বিভিন্ন রাস্তার লক্ষাধিক গাছ থেকে পেরেক তোলেন। কিছুদিন বিরতি নিয়ে তিনি আবারো কাজ শুরু করেছেন। আর এবার শুরু করেছেন যশোরের শার্শা উপজেলা থেকে। একবার বাড়ি থেকে বেরিয়ে দীর্ঘদিন সময়ে তিনি বাড়ি ফেরেননা। কাজের ব্যস্ততায় বেশিরভাগ দিন গোসল হয়না তার।
তার ভাষায়, কাজ করতে করতে যেখানে রাত হয় সেখানে ঘুমিয়ে পড়েন তিনি। এই ঘুমের জায়গা হলো পথের ধারের চায়ের দোকানের বেঞ্চ অথবা স্কুল-কলেজের বারান্দা। গাছে বিল বোর্ড টাঙানো বেআইনি। বিশেষ করে পেরেক ঠুকে বিল বোর্ড টাঙানো বড় অপরাধ। ওয়াহেদ আলী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পেরেক তুলতে গিয়ে যাদের বিল বোর্ড সরানো হয়েছে তারা কিছু বলেনি, বলেছে অতি উৎসাহী পুলিশ। অথচ পুলিশ হলো আইন প্রযোগকারী সংস্থা। দেয়াল লিখন ও পোস্টার লাগানো (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০১২ অনুযায়ী কোনো প্রকার প্রচার কাজে গাছ ব্যবহার করা যাবে না। কিন্তু রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন সংস্থা এ আইন পরোয়া করছে না।
তারা প্রচার কাজে শুধু গাছ ব্যবহারই করছে না, নির্দয়ভাবে গাছে বড় বড় পেরেকও ঠুকছে। আবদুল ওয়াহেদ সরদার দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, একদিক থেকে তিনি যে গাছের পেরেক তোলেন, অন্যদিকে সেই গাছে আবার পেরেক ঠুকে বিল বোর্ড টাঙানো হয়। বিষয়টির প্রতি বন বিভাগ ও প্রশাসনের কোনো নজর নেই। অথচ কাজটা কিন্তু তাদেরই। আইন বাস্তবায়নে তারাই দায়িত্বপ্রাপ্ত। গাছের প্রতি প্রাণের টানে তিনি বাংলা ১৪১২ সাল থেকে গাছ লাগানো শুরু করেন। তিনি নিজের খরচে প্রায় ৯০ বিঘা জমিতে গাছ লাগিয়েছেন। তার রোপিত গাছের সংখ্যা সাড়ে ১৩ হাজার।
এসব গাছের মধ্যে রয়েছে আম, কাঁঠাল, লিচু, পেয়ারা, জামরুল, কালোজাম, কাগজি লেবু, আমড়া, কামরাঙ্গা, জলপাই প্রভৃতি। নিজের জমি না থাকায় তিনি এই গাছ লাগান সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মন্দির, পতিত জায়গা ও রাস্তার পাশে। যশোর কালেক্টরেটচত্বর, এসপি অফিস, পুলিশ লাইন্স এবং চৌগাছা, মণিরামপুর ও অভয়নগর থানাচত্বর, বাগআঁচড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র, বেজপাড়া আনসার ও ভিডিপি ক্যাম্পচত্বর, স্টেডিয়ামপাড়া মিতালী সংঘসংলগ্ন এলাকা, ট্রাফিক অফিস, চেকপোস্ট, বিল হরিণার শ্মশানঘাট, সদর উপজেলার রামনগর ইউনিয়নের আটটি রাস্তাসহ বিভিন্ন স্থানে তার রোপিত গাছ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ওয়াহিদ সরদারের মহৎ কর্মের স্বীকৃতি ঘোষণা করছে।
এ স্বীকৃতিকে অস্বীকার করতে পারেনি সরকারও। তাই তাকে প্রদান করা হয়েছে ‘বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কার-১৪২১’। প্রধানমন্ত্রী তার গলায় পরিয়ে দেন ব্রোঞ্জ পদক। একইসাথে পান ২৫ হাজার টাকা। এবার তিনি শুরু করেছেন যশোরের শার্শা উপজেলায়। শুরুতেই তিনি শার্শার নাভারণ বাজারের সড়কের দুইধারে লাগানো বড় বড় গাছে লাগানো বিভিন্ন বিলবোর্ড ও পেরেক অপসারণ শুরু করলেই ওয়াহিদ সরদারের সাথে দেখা মেলে শার্শার উদ্ভাবক মিজানুরের সাথে। পরিবেশ প্রেমি উদ্ভাবক মিজানুর রহমান ওয়াহিদ সরদারের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বিলবোর্ড অপসারণ এবং গাছের গায়ে ঢোকানো বড় বড় পেরেক তুলে পরিবেশ রক্ষাকারী গাছের জীবন বাঁচাতে একযোগে কাজ করেন।পাশাপাশি উদ্ভাবক মিজানুর রহমান পরিবেশ বন্ধু ওয়াহিদ সরদারের শার্শা উপজেলার মিশনকে সফল করতে তার থাকা ও খাওয়ার দায়িত্ব নেবেন বলে জানান।